আল্লামা আলূসীর তিনটি ব্যাখ্যা

প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা আনূসী বাগদাদী (রহ.) তাফসীরে রুহুল মাআনীতে فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ অর্থাৎ আল্লাহ তা’য়ালা ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের পাপকে পূণ্যে পরিবর্তন করে দিবেন। এর তিনটি ব্যাখ্যা করেছেন যা নিম্নে প্রদত্ত হলো,

গুনাহকে নেকীর মাধ্যমে বদলে দেয়ার প্রথম তাফসীর:

আল্লাহ পাক, তার অতীত গুনাহকে মিটিয়ে ভবিষ্যতে সে যে নেক আমলগুলো করবে তা সে স্থানে লিখে দিবেন এবং শূন্য কোন স্থান রাখবেন না। কেননা ফেরেস্তারা শূন্যস্থান দেখে একথা বলবেন যে, নিশ্চয় এখানে কোন রহস্য আছে। তাই এই স্থানটি লেখাশূন্য দেখা যাচ্ছে। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত এই শূন্য স্থানটি নেকী দিয়ে ভরপুর করে বান্দার মর্যাদাকে রক্ষা করবেন। যেমন কোন চলচিত্রের নায়ক তওবা করে নামাজ পড়তে শুরু করল, দাঁড়ি রেখে দিল এবং হজ্ব পালনের জন্য মক্কায় গেল। তখন আল্লাহ পাক তার আমল নামায় লিখিত সকল গান-বাজনাকে মিটিয়ে সে স্থানে লিণে দিবেন,

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكُ لَا شَرِيْكَ لَكَ

যার অর্থ: হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত হয়েছি। তোমার দরবারে হাজির হয়েছি। তোমার কোন অংশীদার নেই। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই জন্য। সার্বথৌমত্ব তোমারই জন্য। তোমার কোন অংশীদার নেই।

গুনাহকে নেকীর মাধ্যমে পরিবর্তন করার দ্বিতীয় তাফসীর:

দ্বিতীয় তাফসীর হলো, গুনাহের তাগাদা ও চাহিদাকে নেকীর চাহিদায় পরিবর্তন করে দেন। যেমন কোন ব্যক্তি গুনাহে আসক্ত ছিল, গান-বাজনা, ভিসিআর, সিনেমার জন্য ব্যাকুল ছিল সে তওবা করে সকল গুনাহ ছেড়ে দিল। এখন সে আল্লাহ ওয়ালাদের কাছে যাতায়াত করে। নেক কাজের বদৌলতে আল্লাহর অনুগ্রহ তার গুনাহের প্রবল বাসনাকে নেকীর তীব্র আকাংখায় রূপান্তরিত করল।

দ্বিতীয় তাফসীরের জন্য একটি শর্ত:

দ্বিতীয় তাফসীর অর্থাৎ গুনাহের চাহিদাকে নেকীর আকাঙ্খায় পরিবর্তন করে দেয়ার জন্য একটি শর্ত হলো, গোপনে গুনাহের অভ্যাস রাখা যাবে না। যেমন দুই বন্ধু মেথরপাড়ায় বসবাস করত এবং প্রত্যহ পায়খানার দুর্গন্ধ শুঁকতো। এক সময় তারা মেথরপাড়ায় না থাকার সংকল্প করল। এক বন্ধু মেথরপাড়া থেকে এসে আতরের দোকানে চাকরি নিল এবং দোকানের মালিককে বলল, আমাকে ভাল আতর দিনে। যাতে করে আমি আর পায়খানার গন্ধ না শুঁকি এবং মেথরপাড়ার সাথে আমার সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায। মালিক বললেন, আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি আগরকাঠের আতরই ব্যবহার করো। যার তোলা দশ হাজার টাকা। আরবের রাজপুত্ররা যা ব্যবহার করেন। এর পর থেকে সে নিয়মিত আতর ব্যবহার করতে থাকে। এমনকি ছয় মাসের মধ্যে তার স্বভাবে পরিবর্তন দেখা দেয়। এখন দুর্গন্ধ শুঁকতেই তার বমি আসে।

আর অন্য বন্ধু মেথরপাড়া থেকে তারই সাথে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু সে লুকিয়ে লুকিয়ে মাঝে মধ্যে মেথরপাড়ায় যেত এবং দুর্গন্ধ শুঁকত। না যেতে দেয়ার ভয়ে সে তার নিজ মুরব্বীকে বিষয়টি জানায় নি। বলুন দেখি তার কি কখনো পায়খানার দুর্গন্ধের প্রতি ঘৃণা জন্মাবে? তার স্বভাবে কি পরিবর্তন সাধিত হবে? সে জালিমতো নিজেই নিজের পায়ে কুঠাল মেরেছে।

হযরত মাও. রুমী রহ. এ বিষয়টি বড়ই ব্যথাভরা অন্তরে ব্যক্ত করেছেন। আমিও আপন দোস্ত-আহবাবদের সাথে খুব বেদনার সাথে বলছি,

دست ماچوں پاۓ مارامی خورد
بے اماں توکیسےجاں کےبرد

নিজের দুপায়ে যে করেছে আঘাত

তোমার দয়া ছাড়া পাবে কি নাজাত

বন্ধুগণ! আমরা নিজেরা নিজেদের প্রতি দয়া করতে শিখি। অন্যথায় সারা জীবন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও অশান্তির মাঝে কাটবে। দুনিয়ার শাস্তি তো আছেই কবরেও আযাব হবে।

তাই আমি আল্লাহর ওয়াস্তে বলছি, যারা কোন বুযুর্গের হাতে বাইয়াত হয়েছেন তারা যেন সংগোপনে অসৎ পরিবেশে যাওয়া ও লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। আল্লাহর শাস্তির অপেক্ষায় না থাকেন। যারা প্রকৃতপক্ষে তওবা করে আল্লাহ পাক তাদের গুনাহের বাসনাকে নেক কাজের আকাংখায় পরিণত করে দেন। এক-দুই বছর গুনাহমুক্ত অবস্থায় কাটালে আল্লাহ চাহেতো অন্তর আর গুনাহ করতে চাইবে না। তার মাঝে পরিবর্তন এসে যাবে।

গাইরুল্লাহর প্রতি মন দেয়ার ভয়ানক পরিণতিঃ

বন্ধুগণ! আজ একটি মর্মন্তুদ কাহিনী শোনাব। আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম জাওযী (রহ.) বর্ণনা করেন, এক প্রেমিক চুপি চুপি আপন প্রিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করত। যখন তার মৃত্যু ঘনিয়ে এল, তখন বন্ধুরা তাকে কালিমা পড়ে নিতে বলল। কালিমার পরিবর্তে সে তখন এই কবিতাটি আবৃত্তি করছিল

رضاک اشھی الی فوادی
من رحمۃ الخالق الجلیل

মহান রবের করুণাধারায় সিক্ত যখন আমি

তোমার তুষ্টি এই হৃদয়ে তখনো বেশি দামী

বন্ধুরা! দেখুন! কুফরীর উপর তার মৃত্যু হল। আপনাদের যেন এমন না হয় যে, অজ্ঞাতসারে গুনাহ করেই গেলেন আর তা মৃত্যুর সময় প্রকাশ পেল ফলে কুফরীর মৃত্যু নিয়ে চিরকালের জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করতে হলো। এ জন্য আমাদের করণীয় হবে যত দ্রুত সম্ভব অন্তর থেকে গাইরুল্লাহকে বের করে ফেলা। যেমনটা জনৈক মুমিন কবির বেলায় ঘটেছে। তার আরজু নামে একজন বেদআতী বন্ধু ছিল। পরবর্তীতে তার বিদআতের প্রতি ঘৃণা জন্মালো। কিন্তু বেদআতী বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বারবার মন চাচ্ছিল। তখন তিনি নিজ অন্তরকে লক্ষ্য করে বললেন,

لےآرزوکانام تودل کونکال دوں
مومن نییں جوربط رکھیں بدعتی سے ہم

হে হৃদয় তোকে ছুড়ে ফেলে দেব * যদি নিবি ফের আরজুর নাম

বিদআতীর সাথে ভাব থাকে যার * মন থেকে তার হারায় ঈমান

আমি আমার বন্ধুদেরকে বলছি, যারা গুনাহ থেকে এ মর্মে তওবা করেছে যে, গুনাহের জায়গা ও আড্ডায় কখনো যাবে না। তারাও তাদের অন্তরকে একথা বলে দিন, হে অন্তর! যদি গুনাহের নাম নাও তাহলে আমিও তোমাকে আমার বুক থেকে বের করে দিন। আমি রমজান মাসে মসজিদে বসে ঘোষণা করছি, যদি পূর্ণ এক বছর গুনাহ থেকে বাঁচা যায় তাহলে আল্লাহ চাহে তো, অন্তর পরিবত্র হয়ে যাবে। আর আল্লাহ তায়ালা গুনাহের বাসনাকে নেকীর আকাংখায় পরিবর্তন করে দিনে। 

গুনাহকে নেকীর মাধ্যমে পরিবর্তন করার তৃতীয় ব্যাখ্যাঃ

তৃতীয় তাফসীর হলো, আল্লাহ তায়ালা তওবার বরকতে তার সগীরা গুনাহগুলোকে মাফ করে সেস্থানে নেকী লিখে দিবেন। যার বর্ণনা দিতে গিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেন, যা মুসলিম শরীয়ফেল রেওয়ায়েতে আছে-

يُؤْتي بِالرَّجُلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

কিয়ামত দিবসে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে। এরপর আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে বলবেন اِعْرِضُوْاعَلَيْهِ صَغِيْرَ ذُنُوْبِهِ তোমরা এই ব্যক্তির ছোট ছোট অপরাধুগলো পেশ কর। তখন তারা তার ছোট ছোট গুনাহকে পেশ করবে এবং তার বড় বড় গুনাহগুলো লুকিয়ে রাখা হবে। এরপর আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি কি এই গুনাহ করেছিলে? তখন সে বলবে হ্যাঁ। সে ধারণা করে নিবে যে, জাহান্নাম আমার জন্য অবধারিত। এরপর আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে বলবেন, তার সগীরা গুনাহের স্থানে নেকী লিখে দাও।

অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, কিয়ামত দিবসে এই লোকের সাথে করম ও অনুগ্রহের আচরণ করা হবে। আল্লামা আলূসী বাগদাদী (রহ.) তাফসীরে রুহুল মাআ’নীতে উল্লেখ করেন এটাকে ক্ষমার মহানুভবতা বলা হয়। আল্লাহ গুনাহ ক্ষমাও করেছেন এবং তার স্থানে নেকী দিচ্ছেন। কতইনা মহানুভব দানশীল মাওলা পাক। তখন সেই ব্যক্তি এই মহাত্ম্য দেখে বলে উঠবে,

হে আল্লাহ! আমার আরও অনেকগুলো বড় গুনাহ রয়েছে তা দেখছি না কেন? দেখুন কেমন নির্লজ্জতা? যখন ছোট ছোট গুনাহের পরিবর্তে নেকীর পুরষ্কার পেলো তখন নিজের বড় বড় গুনাহকে আল্লাহর সামনে পেশ করছে এবং বলছে হে আল্লাহ আমার বড় গুনাহ ছিল সেগুলো দেখছি না কেন? এর বর্ণনা দিতে গিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে ছিলেন। এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁত প্রকাশ পেয়েছে। যখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসেছেন তখন আশা করা যায় এ কথা গুনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও হাসবেন। ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: দয়া করে কপি করা থেকে বিরত থাকুন, ধন্যবাদ।