• সোমবার
  • ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
  • ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)

খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের বিশ্ব: মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো

আপডেট : অক্টোবর, ১২, ২০১৮, ৩:৪৭ অপরাহ্ণ

মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো

এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই যে, খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী ছিলো মানবজাতির ইতিহাসে সবছে অন্ধকার যুগ। শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ যে অধঃপতনের পথের চলেছিলো, এটা ছিলো তার শেষ ধাপ। পৃথিবীতে তখন এমন কোন কল্যাণশক্তি ছিলো না, যা বিভ্রান্ত মানবতাকে হাত ধরে পথ দেখানে এবং চূড়ান্ত পতন থেকে রক্ষা করবে, বরং দিন দিন তার পতন ও অধঃপতনের গতি যেন বেড়েই চলেছিলো। খালিক, মালিক আল্লাহকে ভূলে গিয়ে মানুষ তখন নিজেকেই ভূলে গিয়েছিলো এবং নিজের পরিণাম-পরিণতি সম্পর্কে হয়ে পড়েছিলো উদাসীন। সে হারিয়ে ফেলেছিলো তার স্বভাবগত বোধ ও বুদ্ধি এবং কল্যাণ-অকল্যাণের বিবেচনাশক্তি। ভালো কী, মন্দ কী? সত্য কী, মিথ্যা কী? তা যেন তার জানই ছিলো না!আল্লাহর আদেশে নবিগণ হকের যে দাওয়াত দিয়েছিলেন, বাতিলের শোরগোলে তা চাপা পড়ে গিয়েছিলো বহু আগেই। মানুষের সমাজে হেদায়াতের যে বাতি তাঁরা জ্বেলেছিলেন, তাদেঁর পর বাতিলের ঝড়-ঝাপটায় হয় তা নিভে গিয়েছিলো, কিংবা ছিলো নিভু নিভু। যুলমাতের ঘোর অন্ধকারে সেই নিভু নিভু প্রদীপ হয়ত জনপদে আলোতো দূরের কথা, ছিলোনা সামান্য আলো আভাস। দ্বীনের যারা ধারক ও বাহক তারাও পিছু হটে গিয়েছিলেন যিন্দেগির ময়দান থেকে এবং কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন মন্দিরে গির্জায় এবং ঘরের ইবাদতখানায়। তারা ভেবেছিলেন, এভাবে অন্তত নিজেদের দ্বীন-ঈমান রক্ষা পারে যামানার ফিতনা থেকে এবং বাকি জীবন কেটে যাবে আরামে নির্ঝঞ্ঝাটে। আসলে এটা ছিলো জীবনের বাস্তবতা ও দায়-দায়িত্ব থেকে তাদের পলায়ন। এটা ছিলো ধর্মশাসন ও রাজশাসন এবং আধ্যাত্মবাদ ও বস্তুবাদের দ্বন্দ্বযুদ্ধে তাদের কাপুরুষোচিত পরাজয়ের নামান্তর। এককথায়, প্রবল ঝড়তুফানের মুখে তারা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং জনপদ ও জনসমাজের নেতৃত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। অল্প ক’জন, যারা তখনো রয়ে গিয়েছিলো যিন্দেগির ময়দানে ঝড়তুফানের মাঝে, তারা ধরেছিলো সমঝোতার পথ, শাসক ও শোষকদের সঙ্গে। যুলুম ও শোষণ-নিপীড়নের ক্ষেত্রে তারা ছিলো রাজশক্তির ধর্মীয় সহযোগী। অন্যায় পথে মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনে তারাও ছিলো দুনিয়াদারদের সমান অংশীদার। এককথায় তারা ছিলো দ্বীনের বিক্রেতা ও দুনিয়ার খরিদদার।

ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এবঙ কালের বিবর্তনধারায় শাসন ও সিংহাসন ব্যক্তি থেকে ব্যকিতএত, পরিবার থেকে পরিবারে এবং জাতি থেকে জাতিতে বদল হতেই থাকে। কিন্তু শোষণ-নিপীড়ন এবং মানুষের উপর মানুষের শাসন চালানোর ক্ষেত্রে তারা যেহেতু একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ, তাই ক্ষমতার এই পালাবদলে মানবতার কিছু যায় আসে না। নীতি ও নৈতিকতার অবক্ষয় এবং জরা ও জড়তার পচনে যে জাতি আক্রান্ত, তদ্রূপ যুলুম-শোষণ ও অনাচার-স্বেচ্ছাচারে যে সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ ধ্বসে পড়েছে সেই সাম্রাজ্যের পতনে এবং সেই জাতির অধঃপতনে এ জগতসংসার না কখনো দুঃখবোধ করে, না কোন শোক প্রকাশ করে, বরং এটাই বিশ্বজগত ও তার ঐশী ব্যবস্থার স্বভাবদাবী। কোন রাজা ও রাজ্যের বিদায়ে মানুষের চোখ থেকে অশ্রু ঝরবে, চোখের অশ্রু এর চেয়ে অনেক মূল্যবান। মানবতার কল্যাণসাধনে যার কোন কীর্তি ও কর্ম নেই; সভ্যতার উন্নতিবিধানে যার কোন দান ও অবদান নেই তার শোকে বিলাপ করবে, সে অবসর কোথায় মানুষের! এসব ঘটনা তো অতীতে ঘটেছে বহুবার, ভবিষ্যতেও ঘটবে বারবার। নির্লিপ্ত আসমান-যমীন তো দেখে আসছে নিরবধিকাল-

কত বাগবাগিচা, কত ঝরণাধারা, কত ফল-ফসল এবং কত উন্নত স্থান তারা ছেড়ে গেছে এবং (ছেড়ে গেছে) কত নেয়ামত, যার ভোগে তারা মগ্ন ছিলো। এভাবেই অন্যকোন জাতিকে আমি এগুলোর উত্তরাধিকার দান করেছি, কিন্তু তাদের শোকে কাদেঁনি আসমান ও যমীন, তাদের দেয়া হয়নি অবকাশ। (দোখান, ৪৪: ২৫-২৮)

বরং এসব সম্রাট ও সাম্রাজ্য এবং জাতি ও নৃপতি পৃথিবীর জন্য ছিলো বোঝা, মানবজাতির জন্য ছিলো অভিশাপ এবং ক্ষুদ্র ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য ছিলো আযাব। সভ্যতার দেহে তারা ছিলো রোগ-ব্যাধির উৎস, যেখান থেকে দেহের রগ-রেশায় ছড়িয়ে পড়ে রোগজীবাণু, এমনকি সুস্থ্য দেহেও ঘটে রোগের সংক্রমণ। এ অবস্থায় অনিবার্য হয়ে পড়ে কঠিন কোন অস্ত্রোপচার। রোগাক্রান্ত অঙ্গের কর্তন এবং সুস্থ্য দেহ থেকে তার অপসারণ, প্রকৃতপক্ষে এটা হলো রাব্বুল আলামীনের রাবূবিয়াত এবং তাঁর অসীম দয়া ও রহমতেরই অভিপ্রকাশ। এজন্য মানব-পরিবারের, বরং বিশ্বজগতের সকল সদস্যের অবশ্যকর্তব্য হলো রাব্বুল আলামীনের হামদ ও প্রশংসা করা এবং তাঁর প্রতি শোকর ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

যে কাওম যুলুম করেছে তাদের গোড়া কেটে দেয়া হয়েছে, সুতরাং সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। (আন’আম, ৬: ৪৫)

কিন্তু…কিন্তু মুসলিম উম্মাহ তো ছিলো নবুয়ত ও রিসালাতের বার্তাবাহী। মানবদেহের জন্য বিশুদ্ধ রক্ত যেমন, বিশ্বমানবতার জন্য তো তাদেরও ছিলো তেমনি প্রয়োজন! সুতরাং তাদের শাসন ও সাম্রাজ্যের পতন এবং তাদের জাতিগত অবক্ষয়-অধঃপতন নিছক একটি জাতি ও জনগোষ্ঠীর এবং দেশ ও জনপদের পতন বা অধঃপতন ছিলো না, বরং তা ছিলো একটি আদর্শের এবং একটি বার্তা ও রিসালাতের পতন, যা মানবসমাজের জন্য রূহ ও প্রাণসমতুল্য। তা ছিলো এমন এক স্তম্ভের ধ্বস, যার উপর নির্ভর করে দ্বীন ও দুনিয়ার নেযাম ও ব্যবস্থাপনা। তো মুসলিম উম্মাহর পতন এবং জীবনের অঙ্গন থেকে তাদের অপসৃতি কি বাস্তবেই এমন কোন ঘটনা ছিলো, যার জন্য পূর্ব-পশ্চিমের সকল মানবসমাজের শোকে সন্তাপে অশ্রুপাত করা কর্তব্য, ঘটনার এত যুগ, এত শতাব্দী পরও? বিশ্বজগত সত্যি কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই উম্মাহর পতনে, অধঃপতনে, বিশ্বের নেতৃত্ব থেকে তার অপসৃতিতে? অথচ এ বিশ্বে জাতি ও সভ্যতার এবং জনপদ ও জনগোষ্ঠীর তো কমতি নেই! কী ধরনের ক্ষতি ও দৃর্গতি ছিলো তা? ইউরোগীয় জাতিবর্গ বিশ্বের শাসন ও নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর এবং মুসলিম সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের উপর তাদের বিশাল বিস্তৃত নবসাম্রাজ্য গড়ে তোলার পর পৃথিবীর রূপ ও প্রকৃতি কী দাড়িয়েঁছে এবং মানবজাতি কী পরিণাম ও পরিণতির শিকার হয়েছে? বিশ্বের শাসন ও মানবজাতির নেতৃত্বে এই বিরাট পরিবর্তনের কী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, দ্বীন-ধর্ম, আখলাক-চরিত্র, নীতি ও নৈতিকতা এবং শাসন ও জীবন সর্বক্ষেত্রে ? এককথায়, মানব ও মানবতার ভাগ্যনির্মাণের ক্ষেত্রে? সর্বোপডরি আগামী বিশ্বের গতি-প্রকৃতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে যদি ইসলামী বিশ্ব জেগে ওঠে এবং আবার জীবনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে? এসকল প্রশ্নেরই বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভর জবার দিতে চেষ্টা করবো আগামী পৃষ্ঠাগুলোতে।

পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর পতন-অধঃপতনের ঘটনা বারবার ঘটেছে। বহু রাজ্য ও সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়েছে। জনপদের পর জনপদ পদানতকারী বহু সম্রাট ও সেনাপতি একসময় চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করেছে। কালের নির্মম থাবায় বহু সমৃদ্ধ সভ্যতা ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়ে এমনভাবে হারিয়ে গেছে যে, এখন খোঁড়াখুড়িঁ করে তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ উপস্থিত করতে হয়। মোট কথা, জোয়ারের পর ভাটা এবং উত্থানের পর পতন প্রত্যেক জাতির ইতিহাসেই ঘটেছে। মানবজাতির সাধারণ ইতিহাসে এর উদাহরণের অভাব নেই। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর পতন ও অধঃপতন এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্বনেতৃত্বের আসন থেকে তাদের বিচ্যুতি, আর সর্বশেষে জীবনের কর্মমুখর অঙ্গন থেকে তাদের অপসৃতি, এটা কিন্তু ইতিহাসের বারবার দেখা সাধারণ কোন ঘটনা নয়। এ এমন এক বিরল ঘটনা, যার নযির মানবজাতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর নেই; অথচ যে কোন বিরল ঘটনারই কোন না কোন নযির ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যা।

এ মর্মন্তুদ ঘটনা ও বিপর্যয় শুধু আরবদের নয়, এমনকি ঐসব জাতি ও জনগোষ্ঠীরও নয়, নিজ নিজ ধর্মত্যাগ করে ইসলামের পতাকাতলে যারা সমবেত হয়েছিলো; বিশেষ কোন ঘর ও ঘরানার তো নয়ই, যারা শাসন ও সিংহাসন থেকে বিতাড়িত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে; বরং এ এমন ব্যাপক ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, যার স্বাক্ষী হয়ে ইতিহাস নিজেও আজ স্তব্ধ। কারণ আগে বা পরে এমন করুণ ও নিদারুণ ঘটনার সম্মুখীন ইতিহাস আর কখনো হয়নি। বিশ্ব যদি এ বিপর্যয়ের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে পারতো; সাম্প্রদায়িকতার কুয়াসাচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্ব যদি নিজের ক্ষতি ও দৃর্গতির গভীরতা ও গুরুতরতা কিছুমাত্র বুঝতে পারতো, সর্বনাশের সেই দিনটিকে তাহলে সে কান্না ও বেদনার এবং শোক ও সন্তাপের দিবসরূপে গ্রহণ করতো  এবং বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠী একে অপরকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করতো। এককথায় সেটা হতো কালো পোশাক ধারণের বিশ্বশোকদিবস। কিন্তু এ বিপর্যয় একদিনে ঘটেনি, ঘটেছে ধীর পর্যায়ক্রমে, কয়েক যুগের দীর্ঘ সময়-পরিসরে। তদুপরি বিশ্ব এখনো এ ঘটনার সঠিক মূল্যায়নের কোন উদ্যোগও গ্রহণ করেনি। তাছাড়া নিজের বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের পরিমাণ নিরূপণের সঠিক মাপকাঠিও তার জানা নেই। তাই এ বিষয়ে এখনো সে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির শিকার। আর অজ্ঞতা হলো বেদনা ও যন্ত্রণার বিরাট উপশম।

জাতি হিসাবে যদিও আমরা আজ বিপর্যস্ত ও পর্যুদস্ত এবং এখনকার বিশ্ব শাসকদের দ্বারা চরমভাবে নিগৃহীত ও নির্যাতিত, তবু আসমানি রিসালাতের দায়দায়িত্ব থেকে কোনভাবেই আমরা মুক্ত হতে পানি না। তাই আমাদের এখন দায়িত্ব হলো, বিশ্বের সামনে তার ক্ষতি ও দৃর্গতির এবং বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের সঠিক চিত্র তুলে ধরা, যাতে সে অনুধাবন করতে পারে, মুসলিম উম্মাহর পতনের উল্লাসের মধ্য দিয়ে সে নিজে কী মহাসর্বনাশ ডেকে এনেছে! এজন্য আইয়ামে জাহেলিয়াত, ইসলামের আবির্ভাব, মুসলিম উম্মাহর উত্থান ও তার সুফল, পতন ও পরিণাম এবং উত্থান ও পতনের কার্যকারণ, ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করতে হবে। তো প্রথমে আমরা আলোচনা করবো. ইসলামের আবির্ভাবপূর্ব সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের কী অবস্থা ছিলো?

আহলে হক ওয়াজ

আর্কাইভ

SunMonTueWedThuFriSat
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
1234567
15161718192021
22232425262728
2930     
       
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
error: দয়া করে কপি করা থেকে বিরত থাকুন, ধন্যবাদ।