• শনিবার
  • ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি
  • ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)

আল্লামা মুফতি ছাঈদ আহমদ মু. যি এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

আপডেট : অক্টোবর, ৩, ২০১৮, ২:১১ পূর্বাহ্ণ

শায়খ সোলতান আহমদ নানুপুরী রহ. এর বিশিষ্ট খলীফা
জামিয়া সোলতানিয়া লালপোল ফেনী’র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শাইখুল হাদিস আল্লামা মুফতি ছাঈদ আহমদ মু. যি এর

: সংক্ষিপ্ত জীবনী :

……………………………………
শরীয়ত ও তরীকতের এক সিপাহসালার
হাকীমুল ওলামা আল্লামা মুফতি ছাঈদ আহমদ দা.বা
★★★★★★★★★★★★★
আল্লামা মুফতি ছাঈদ আহমদ সাহেব বর্তমান বিশ্বের একজন খ্যাতনামা মুফতি। যিনি মানুষকে শরীয়তের সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার পথহারা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ ভোলা বান্দাদেরকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দিচ্ছেন। এক কথায় তিনি যেমন খ্যাতনামা মুফতি, অনুরূপ একজন মুর্শিদে কামেল তথা খাটি পীরও। বক্ষমান প্রবন্ধে এ মহান ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনা করা হল।

জন্ম ও পরিচিতি:
আল্লামা মুফতি ছাঈদ আহমদ সাহেব ১৯ চৈত্র, ১৩৫৪ বাংলা, রোজ শুক্রবার জুমার নামাযের পূর্বে ফেনী জেলার অন্তর্গত ছনুয়া গ্রামের এক দ্বীনদার সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী এহসানুল্লাহ সওদাগর ও মাতার নাম মোছাম্মৎ আসিয়া।
জনৈক বুযুর্গের ভবিষ্যৎবাণী সত্যে পরিণত:
মুফতি সাহেবের মাতা-পিতা উভয়েই ছিলেন আলেম ওলামার পৃষ্ঠপোষক। এজন্য সর্বদা কোন আলেমকে তাঁদের ঘরে জায়গীর রাখতেন। অথচ তাঁদের ঘরে লেখা-পড়া করার মত কোন সন্তান ছিল না। সে হিসেবে মাওলানা কবীর আহমদ নামক একজন বুযুর্গ তাঁদের ঘরে জায়গীর থাকতেন। মুফতি সাহবের আব্বাজান উক্ত মাওলানা সাহেবসহ জুমার নামায আদায় করতে গেলেন। নামায শেষে বাড়িতে এসে নবাগত শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। অতঃপর ছেলে হয়েছে জেনে উক্ত মাওলানা সাহেব বললেনঃ এ ছেলে হয়ত ভবিষ্যতে বড় আলেম হবে। আজ সে ভবিষ্যতবাণীটি ষোল আনাই বাস্তবায়ন হয়েছে।
শিক্ষা জীবন:
মুফতি সাহেবের ছোট বেলা থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহ ছিল। তাঁর মাতা-পিতা তাঁকে জনৈক হিন্দু শিক্ষকের নিকট সোপর্দ করার শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একটি স্কুলে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল, স্বভাবগতভাবে স্কুলে তার তন্ গেলেও মন যেত না। এভাবে দু’বছর স্কুলে পড়ার পর তাঁকে রহিমপুর মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। মাদরাসার পড়া তাঁর স্বভাবের সাথে খাপ খাওয়ার কারণে মাদরাসায় ভর্তি করানোর সাথে সাথে পড়া লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। উক্ত মাদরাসায় তিনি জামাতে হাস্তুম পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
অতঃপর তাঁর বিশিষ্ট উস্তাদ মাওলানা আব্দল মতিন সাহেব তাঁকে মিরশ্বরাই জামালপুর মাদরাসায় ভর্তি করান। জামালপুর মাদরাসায় তিনি জমাতে দুওম পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। উল্লেখ্য যে, জামালপুর মাদরাসায় জামাতে সিউম পর্যন্ত ছিল। তাঁর খাতিরে জামাতে দুওম খোলা হয়েছিল। প্রতি পরিক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করতেন, এমনকি তিনি জমাতে সিউমের (একাদশ শ্রেণি) বছর এত্তেহাদুল মাদারিসিল কওমিয়া (বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড) এর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
তিনি জামাতে হাফতুমের বছর থেকেই নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামায পড়তে অভ্যস্ত হন। জমাতে চাহারুমের বছর স্বপ্নে দেখলেন যে, কুতবুল আলম ইমামে রব্বানী পটিয়ার হযরত মুফতি আজিজুল হক সাহেব রহ. তাঁকে শাইখুল মাশায়েখ হযরত শাহ সোলতান আহমদ নানুপরী রহ. এর হাতে তুলে দিয়েছেন। এজন্য তিনি চাহারুমের বছর নানুপুরী হযরত রহ. এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন।
জামালপুর মাদরাসা থেকে বিদায় নিয়ে পটিয়া মাদরাসায় যাওয়ার সময় মাদরাসার মুহতামিম সাহেবসহ মাদরাসার সকল ছাত্র-শিক্ষক জামালপুর মাদরাসা থেকে দেড় মাইল দুরে ‘চিনকি আস্তানা’ নামক রেল স্টেশনে আসেন। স্টেশনে কান্নাকাটির রোল পড়ে যায়। যার কারণে রেলগাড়ি ছাড়তেও বিলম্ব হয়।
তাঁর একান্ত উস্তাদ মাওলানা আব্দুল মতীন সাহেব তাঁকে সাথে করে নিয়ে পটিয়া মাদরাসায় ভর্তি করালেন। বোর্ডের পরিক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাঁর ভর্তি পরিক্ষা নেননি। পটিয়া মাদরাসায় সে সকল বিভাগ রয়েছে অর্থাৎ মুনাযারা বিভাগ, মুশাআরা বা কবিতা রচনা বিভাগ, আরবি সাহিত্য বিভাগ ও উর্দূ সাহিত্য বিভাগসহ প্রত্যেক বিভাগের পরিচালকগণ তাঁর নাম নিজেদের বিভাগে লিপিবদ্ধ করে ফেলেন। উপর্যুক্ত প্রত্যেক বিভাগেই তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। মুনাযারা বিভাগের যিম্মাদার তাঁর মুনাযারা করার যোগ্যতা দেখে তাঁকে ‘সাইয়্যেদুল মুনাযিরীন’ উপাধি দেন। বার্ষিক মুনাযারা ও কবিতা রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে পুরস্কৃত হন।
পটিয়া মাদরাসায় তিনি দু’বছর অধ্যয়ন করেন। প্রথম বছর ফনুনাতে আলিয়া পড়েন। ফনুনাতের কিতাব ‘কাজী হামদাল্লাহ’ পড়েছেন খতীবে আযম আল্লামা সিদ্দীক আহমদ রহ. এর নিকট। তিি কয়েকদিন পড়ানোর পর মুফতি সাহেবের যোগ্যতা অনুমান করতে পেরে বললেন, আমাকে আর পড়াতে হবে না। আগামীকাল থেকে তুমি কিতাব দেখে এসে অর্থসহ বলবে আর আমরা শুনব। ফনুনাতের বছরও প্রত্যেক পরিক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।
মুফতি সাহেবের ছোট বেলা থেকেই তাঁর প্রতি ছিল নানুপুরী হযরত রহ. নেক দৃষ্টি ও তাঁকে গড়ার ফিকির। ফনুনাতের কোর্স সমাপ্তির শেষের দিকে নানুপুরী হযরত রহ. তাঁর নিকট চিঠি পাঠিয়ে রমযান মাসের শেষ দশদিন নানুপুর মাদরাসায় তাঁর সাথে ই’তিকাফ করার জন্য মুফতি সাহেবকে নিয়ে যান। উক্ত দশদিনের মধ্যে নানুপুরী হযরত রহ. এর তাওয়াজ্জুহ, তাজাল্লী, নসীহত ইত্যাদি দ্বারা তাঁর মধ্যে অত্যন্ত প্রভাব পড়েছিল। একদা তিনি বলেছিলেন, ঐ দশদিনের সোহবতে এ রকম রূহানী তরক্কী অনুভব হয়েছিল যে, দশ বছরের সোহবতেও এরকম হয় না। এমন কি উহার প্রভাব শরীরের মধ্যেও পড়েছিল, যার ফলে ছয়মাস পর্যন্ত তাঁর মুখের রুচী নষ্ট ছিল।
ফনুনাত পড়ার পর জমাতে উলায় ভর্তি হন। উক্ত জমাতে মিশকাত শরীফ প্রথশ খ- পড়েছেন আল্লামা দানেশ রহ. এর নিকট। তিনি মুফতি সাহেবকে তাঁর অনুপম চরিত্রের জন্য খবই ভালবাসতেন। আর ঘন্টার মধ্যে তাঁর সামনেই বসাতেন। ঘটনাক্রমে একদিন তিনি পেছনে বসলে তাঁকে সামনে এনে বললেন, তুমি সব সময় আমার সামনেই বসবে। কেননা তুমি সামনে না থাকলে আমার পড়ানোর স্পৃহা জাগে না।
মুফতি সাহেব মিশকাত শরীফ তাকরার করতেন। আল্লামা দানেশ রহ. তাঁর তাকরার শুনে বলতেন, আমার মনমত যোগ্য আলেম দক্ষিণ দিকে একজনকে পাঠিয়েছি পূর্ব দিকেও একজনকে পাঠিয়েছি। কিন্তু পশ্চিম দিকে পাঠানোর জন্য কাউকে খুঁজে পেলাম না। আশা করি আল্লাহ তা‘আলা তোমার দ্বারা আমার মনের আশা পূরণ করবেন। অতঃপর তিনি ছাত্রদেরকে তাঁকে মুহাদ্দিস সাহেব বলার জন্য হুকুম করলেন এবং নিজেও মুহাদ্দিস সাহেব বলে ডাকতেন।
হিদায়া তৃতীয় খ- পড়েছেন মুফতি ইবরাহীম রহ. এর নিকট। তিনি যেদিন সবক শুরু করলেন ঐদিন সকল ছাত্রদের থেকে ইবারত পড়া শুনে বললেন, ছাঈদ আহমদ তুমিই সারা বছর ইবারত পড়বে। তাঁর কথা মত সারা বছর তিনিই ইবারত পড়েন।
তিনি হিদায়াও তাকরার করতেন। জমাতের মধ্যে মোট তিনটি ফরীক বা গ্রুপ ছিল। মুফতি সাহেব তাকরার শুরু করার পর তাকরারের সব ফরীক ভেঙ্গে গিয়ে এক ফরীক হয়ে যায়। অন্য ফরীকে যারা তাকরার করতেন তারা সহ সবাই তাঁর তাকরার শুনার জন্য একত্রিত হত।
ফতওয়ার খিদমাত:

নানুপুর মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ হওয়ার একদিন পর নানুপুর হযরত রহ. ঘোষণা দিলেন যে, আজ হতে আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে মাদরাসায় দারুল ইফতা বা ফতওয়া বিভাগ কায়েম করা হল এবং মাও. ছাঈদ আহমদ সাহেবকে মুফতি বানানো হল এবং ছাত্রদেরকে বলে দিলেন যে, তোমরা প্রয়োজনীয় মাসআলা তাঁকে জিজ্ঞেস করবে এবং সাধারণ মানুষকেও বলে দিবে। মুফীত সাহেব বললেন যে, তিনি কোন ইফতা বিভাগে ভর্তি হন নাই এবং কারো কাছে ফতওয়া দেয়া শিখেননি। তারপরও যখন নানুপুরী হযরত রহ. এর মোবারক জবানে ফতওয়া দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হল, তিনি বুঝতে পারলেন যে, এতে আল্লাহপাকের কোন রহস্য আছে এবং নিশ্চয় এতে আল্লাহপাকের রহমত হবে। তাই আল্লাহপাকের উপর ভরসা করে তিনি উক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়ে ফতওয়া লিখা আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে তাঁর মাধ্যমে ফতওয়া বিভাগের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিজ্ঞ অভিজ্ঞ মুফতিয়াতে কেরাম মুফতি সাহেবের নিকট তাঁদের ফতওয়া সত্যায়নের জন্য প্রেরণ করা আরম্ভ করলেন। তিনি পাকিস্তানে কখনও যাননি। তা সত্বেও পাকিস্তানের মুফতি বোর্ডে তাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানের জামিয়া বিন্নুরীর তৎকালীন প্রধান মুফতি কয়েকটি মাসআলা ও রেসালা সত্যায়নের জন্য এবং মন্তব্য লিখার জন্য মুফতি সাহেবের নিকট প্রেরণ করেছেন। তাঁর পক্ষ থেকে বিস্তারিত মন্তব্য লিখে পাঠানো হয়েছিল। সেখানকার মুফতিয়ানে কেরাম তা পছন্দ করেছেন। এবং করাচীর জামিয়া বিন্নুরী থেকে প্রকাশিত ‘জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া’ নামক বিরাট ফতওয়া গ্রন্থে তাঁর কয়েকটি উত্তর স্থান পেয়েছে। আবুধাবীর ওয়াক্ফ সচিব শায়খ বশীর মালেকী মাযহাবের অভিজ্ঞ আলেম। তিনি এবার মুফতি সাহেবের নিকট কয়েকটি প্রশ্ন পাঠিয়েছেন। মুফতি সাহেবের পক্ষ থেকে উত্তর পেয়ে খুবই খুশী হয়েছিলেন। খ্যাতনামা একবার এরশাদ সরকারের আমলে মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে তাঁর মধ্যস্থতায় বাংলাদেশের খ্যাতনামা মুফতিয়ানে কেরামের নিকট কয়েকটি প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। চট্টগ্রামে পাঠানো কপির উত্তরের দায়িত্ব হাটহাজারী, পটিয়া, নানুপুর ও বাবুনগর মাদরাসাসমূহের মুফতিগণের নিকট অর্পন করা হয়েছিল। সবার লিখিত ফতওয়ার মধ্যে মুফতি সাহেবের লিখিত দীর্ঘ ৫২ পৃষ্ঠার ফতওয়াটি বড় বড় ওলামায়ে কেরাম ও মুফতিয়ানে কেরামের সর্বসম্মতিতে শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। হযরত নানুপুরী হযরত রহ. ও পটিয়ার হাজী ইউনুস সাহেব রহ. ফতওয়ার কপিটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট এরশাদ ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ওয়াক্কাসের বৈঠকে তাশরিফ নিয়েছিলেন। দেশ-বিদেশ থেকে পাঠানো প্রশ্ন সমূহের জবাব দেয়ার সাথে সাথে তিনি মাসিক আর-রশীদের ফতওয়া বিভাগের প্রশ্ন সমূহের জবাবও লিখতেন।

 

আন্তর্জাতিক মুফতি সেমিনারে আমন্ত্রিত:
১৯৯১ ও ৯২ ইংরেজিতে ভারতের দারুল দেওবন্দের ‘মাহমুদ’ হলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুফতি সেমিনার দ্বয়ের কমিটির পক্ষ থেকে মুফতি সাহেবের নিকট বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। তাঁর পক্ষ থেকে উত্তর দেয়ার পর তাঁরা খুশি হয়ে উক্ত সেমিনার দ্বয়ে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। উভয় সেমিনারে তাঁর উত্তর উপস্থিত অধিকাংশ মুফতিয়ানে কেরামের রায়ের সাথে মিল খেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।
বিভিন্ন মুফতি বোর্ডের সদস্য ঃ
মুফতি সাহেবকে ঢাকাস্থ বাংলাদেশ মুফতি বোর্ডের শুরু লগ্ন থেকেই সদস্য বানানো হয়েছে এবং ঐ বোর্ডের দশ সদস্য বিশিষ্ট বিষেশ কমিটিরও সদস্য করা হয়েছে।
জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার পক্ষ থেকে ‘আল বহুসুল ইসলামী’ নামক দশ সদস্য বিশিষ্ট গঠিত ফতওয়া বোর্ডের জন্ম লগ্ন থেকেই তাঁকে সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্দা য়িত্বসমূহ:
নানুপুর মাদরাসায় থাকাকালীন তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সমূহের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নি¤œপরূপ:
১.ফতওয়া বিভাগের প্রধান ২. শিক্ষা পরিচালক ৩. অধ্যাপনা ৪. আঞ্জুমানে ছোলতানিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব ৫. মাসিক আর-রশীদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তাছাড়া নানুপুরী হযরত রহ. তাঁর দ্বারা বাইরের অনেক মাদরাসার তত্বাবধান ও পরিদর্শনের কাজ আঞ্জাম দিতেন। আর কোন কোন মাদরাসার পুরো দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পন করেছিলেন। আর একাধিক মাদরাসার ভিত্তিও তাঁর মাধ্যমে স্থাপন করেছিলেন। বর্তমানেও তিনি ফেনী লালপোল জামিয়া ইসলামিয়া সোলতানিয়া (মাদরাসা)র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শাইখুল হাদীস ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্বাবধান করছেন।
শিক্ষকতায় তাঁর অবদান:
নানুপুর মাদরাসায় থাকাকালীন যেভাবে মুফতি সাহেবের দ্বারা ফতওয়ার দিক দিয়ে উম্মত উচ্চপর্যায়ে উপকৃত হয়েছেন, এমনিভাবে তাঁর দরসের দ্বারাও অভাবনীয় উপকৃত হয়েছে ছাত্ররা। প্রথম বছর থেকে শেষ পর্যন্ত রদ-বদল হয়ে নিন্মের গুরুত্বপূর্ণ কিতাবসমূহ তাঁর দরসে এসেছিল- গুলিস্তা, নাহবেমীর, মেরকাত, কুতবী, মাকামাত, তাওযীহ, মুসাল্লামাতুস সাবুত, শরহে আদায়েদ, হেদায়া, নাসাঈ শরীফ, বায়যাবী শরীফ, তিরমিযী শরীফ (২য় খ-), মুসলিম শরীফ (কামেল)। নানুপুর মাদরাসায় তাঁর ছাত্রদের মধ্যে মাও. নাসিম রহ., বিশিষ্ট মুহাদ্দিস মাও. আহমদ গণী, জামিয়া ওবাইদিয়ার প্রাক্তন প্রধান মুফতি মাও. আবু ইউসুফ, প্রাক্তন শিক্ষা পরিচালক মাও. আনোয়ার হোসাইন, নানুপুরী হুযুরের সাহেবজাদা মাওলানা এমদাদুল্লাহ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নানুপুরী হযরত (রহ) এর সাথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সফর:
যেহেতু নানুপুরী হযরত রহ. মুফতি সাহেবকে সর্ব ব্যাপারে নিজের জন্য উম্মতের জন্য গড়ে তোলার সর্বদা ফিকিরমন্দ ও আগ্রহী ছিলেন, তাই যেমনিভাবে তাঁকে নানুুপুর মাদরাসায় নিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজের কাছে রেখেছেন তেমনিভাবে তাঁকে হযরতজী রহ. এর বড় সফরেও সঙ্গী হিসেবে রাখার জন্য আগ্রহী ছিলেন। এ কারণেই ১৪০০ হিজরীতে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে আয়োজিত শত বার্ষিকী মহাসম্মেলনে যোগদানের সময় মুফতি সাহেবকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং নানুপুরী হযরত রহ. এর আখেরী হজ্বেও তাঁকে নিয়ে যান।
নানুপুরী হযরত (রহ) এর গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র লিখন:
নানুপুরী হযরত রহ. এর গুরুত্বপূর্ণ চিঠি-পত্র ইত্যাদি মুফতি সাহেবের মাধ্যমেই লিখতেন। অনেক খলিফাদের খেলাফতের চিঠি তাঁর হাতেই লিখিয়েছেন। খোলাফাদের নামের তালিকাভূক্ত খাতা নানুপুরী হযরত রহ. এর নিকট একটি রেখেছিলেন। আরেকটি রেখেছিলেন মুফতি সাহেবের নিকট। তিনি নানুপুরী হযরতের ইন্তেকালের পর সমস্ত খোলাফাদের নাম মাসিক আর-রশীদের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন।
নানুপুর মাদরাসা থেকে বিদায়:
মুফতি সাহেব মু.যি. দীর্ঘ ১৯ বছর পর্যন্ত নানুপুর মাদরাসায় অবস্থান করে উপরোল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহ অত্যন্ত সচেতনতা ও দুরদর্শীতার সাথে আঞ্জাম দেন। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ কারো পক্ষ থেকে তাঁর ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোন অভিযোগ শুনা যায়নি বরং সকলের মুখ থেকে তাঁর ব্যাপারে প্রশংসাই পরিলক্ষিত হয়েছে। হযরতজী রহ. এর ইন্তেকালের পরও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে মুহতামিম হযরত মাওলানা জমীরুদ্দীন সাহেব রহ. তাঁকে বিদায় দিতে রাজী ছিলেন না। বরং আজীবন উল্লেখিত দায়িত্বসমূহের সাথেই তাঁকে রাখতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু যেহেতু কুতবুল আলম হযরতজী রহ. মুফতি সাহেবের ব্যাপারে হুকুম জারী করেছিলেন যে, আমার ইন্তেকালের পর তুমি ফেনী লালপোলস্থ সোলতানিয়া মাদরাসাতে অবস্থান করে খেদমত আঞ্জাম দিবা। তাই হযরতের অসিয়ত মূল্যায়ন করতঃ পারস্পরিক মায়া-মমতা ও বিদায়ী বেদনা প্রকাশের মাধ্যমে ১৪২০ হিজরীর শা‘বান মাসে তাঁর তা’লিমাতী এন্তেজামের মাধ্যমে বার্ষিক পরিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি নানুপুর মাদরাসা থেকে বিদায় নিয়ে যান।
ফেনী লালপোল মাদরাসায় অবস্থান:
মুফতি সাহেবের আখেরী হায়াত পর্যন্ত খেদমতের স্থান হিসেবে ফেনীর লালপোল এলাকায় নানুপুর হযরত রহ. নিজ হুকুমে জায়গা খরীদ করে স্বীয় তাহ মোবারকে মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন। এবং তিনি হুকুম জারী করলেন, আমি যতদিন বেঁচে থাকি তুমি নানুপুর মাদরাসা থেকে যেতে পারবে না। বরং যাতায়াতের মাধ্যমে উক্ত মাদরাসা পরিচালনা করবে। আমার ইন্তেকালের পর স্বয়ং ওখানে অবস্থান করে মাদরাসার খেদমত করে যাবে। তাই নানুপুরী হযরত রহ. এর ইন্তেকালের পর তাঁর নির্দেশক্রমে নানুপুর মাদরাসা থেকে বিদায় নিয়ে তিনি ফেনী লালপোল সোলতানিয়া মাদরাসায় অবস্থান করে মাদরাসা পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি অবস্থানের সাথে সাথে দ্রুত গতিতে মাদরাসার ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকে। এমন কি মাদরাসার ঘরে ও মসজিদে ছাত্র সংকুলান না হওয়ার ফলে মাদরাসাটি আদর্শ হয়ে দাড়িয়েছে। বিভিন্ন মাদরাসার জিম্মাদারগণ উক্ত মাদরাসার নিয়ম কানুন জেনে নিয়ে অনুকরণ করছেন।
বিভিন্ন জায়গায় মুনাযারায় অংশগ্রহণ:
ছোটবেলা থেকেই মুফতি সাহেবের অন্তরে ছিল শিরক ও বেদআতের প্রতি ঘৃণা এবং হক ও সুন্নতকে প্রতিষ্ঠিত করার ফিকির। এ কারণে ছাগলনাইয়া মাদরাসায় খেদমতকালে বিভিন্ন জায়গায় বেদআতীদের সাথে মাঠ পর্যায়ে মুনাযারা করেছেন। এবং প্রত্যেক জায়গায় তিনি আল্লাহর রহমতে কামিয়াব হয়েছেন আর প্রতিপক্ষ হেরে গেছে। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুফতি সাবেকে ‘সায়্যেদুল মুনাযিরীন’ উপাধি দেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে তাঁর মুনাযারায় প্রমাণ করল যে, বাস্তবিকই তিনি সাইয়্যেদুল মুনাযিরীন।
খাঁটি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত সংস্থা প্রতিষ্ঠা :
মুফতি সাহেবের মধ্যে হক প্রচার ও বাতিল প্রতিরোধের জযবা ও স্পৃহা বিদ্যমান থাকার কারণে ছাগলনাইয়াতে থাকাকালীন ওলামা বাজার, ঘাটঘর, ফুলগাজী মাদরাসা সমূহের অভিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামদেরকে ডেকে ‘খাঁটি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত পরিষদ’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ সংস্থা থেকে সহীহ আক্বিদা ও আমল সম্পর্কীয় কয়েকটি দ্বীনি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। যেমন, ১. ওহাবী কে? সুন্নী কে? ২. মাথা কামানোর ফতওয়া ও মাইকে শবীনা খতম। ৩. মুনাযারায়ে সোনাপুর ইত্যাদি।
এলাকার আমুল পরিবর্তন:
তাঁর একালাটি ছিল বিদআত কু সংস্কারে নিমজ্জিত। তাদের হেদায়াতের জন্য ছোট বেলা থেকেই তিনি ছিলেন ফিকিরমন্দ। তিনি ভেবেছিলেন যে, বিতর্কিত মাসআলাগুলো বুঝাতে চেষ্টা করলে তারা তা শুনবে না। এজন্য বিতর্কিত বিষয় আলোচনা না করে মানুষকে বুঝায়ে নামাযের দিকে ডাকতেন এবং বেশী বেশী রাসূল সা. এর সুন্নতের কথা আলোচনা করতেন। ধীরে ধীরে তাদের ভুল ভাঙ্গল, তাদের ধ্যান ধারণা পাল্টে গেল। আজ তারা মুফতি সাহেবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এমন কি যারা তাঁকে কাফের বলতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি তারা আজ তার সাথে দেরীতে দেখা হলে অস্থির হয়ে পড়েন। এলাকার বিশাল ঈদগাহে তিনিই ঈদের নামাযের ইমামতি করেন।
ইসলাহী খিদমত:
নানুপুরী হযরত রহ. এর আশা ছিল মুফতি সাহেবের দ্বারা ব্যাপকভাবে মানুষ উপকৃত হওয়া। আল্লাহ তা’আলা তাঁরা আশা পূরণ করেছেন। তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে মানুষকে হিদায়াতের বাণী শুনাচ্ছেন।
হাজার হাজার মানুষ তাঁর হাতে বাইয়াত হয়ে আত্মশুদ্ধি করে আল্লাহ তা’আলার প্রিয়পাত্র হচ্ছেন।
মাহে রমযান আগমন করলে মুফতি সাহেব মু.যি. এর সোহবতে থেকে আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে বড় বড় আলেম-ওলামা থেকে নিয়ে বিভিন্ন স্তরের জনতা লালপোল সোলতানিয়া মাদরাসায় ই’তিকাফ করার জন্য সমবেত হন। তাদের মধ্যে কিছু আসেন চল্লিশ দিনে জন্য, কিছু পুরো রমযানের জন্য, আর কিছু আসেন রমযানের শেষ দশদিনের জ্য। মুফতি সাহেব তাঁদেরকে ইসলাহী সবক দনে, বয়ান করেন।
শুক্রবারে অন্য কোথাও দাওয়াত না নিয়ে ফেনী লালপোল জামিয়া ইসলামিয়া সোলতানিয়ায় অবস্থান করবেন। ফলে শুক্রবারে লালপোল মাদরাসায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আলেম ওলামা এবং বিভিন্ন শ্রেণির মেহমানের সমাগম হয়। মুফতি সাহেব তাদেরকে জরুরী হেদায়াতি আলোচনা প্রদান করেন।
কয়েকটি বিশেষ গুণ:
মুফতি সাহেব এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর মধ্যে বহুগুণের সমাবেশ ঘটেছে। তন্মধ্যে একটি হল, সুন্নাতে রাসূল সা. এর অনুসরণ। তাঁর প্রতিটি কাজে রাসূল সা. এর সুন্নতের অনুসরণ পরিলক্ষিত হয়। একদা তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, রাসূল সা. তাঁকে একটি জুব্বা পরিয়ে দিচ্ছেন। শায়খ সোলতান আহমদ নানুপুরী রহ. উক্ত স্বপ্নের তা’বীর বা ব্যাখ্যা করলেন যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাকে রাসূল সা. এর সুন্নতের অনুকরণ করার তৌফিক দিবেন।
তাঁর আরেকটি বৈশিষ্ট হল, সময়ানুবর্তীতা। তিনি কখনও কোন কাজ করবেন এ ব্যাপারে পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা থাকে। পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী তিনি সব কাজ সময় মত সম্পাদন করে থাকেন।
তাঁর আরেকটি বিশেষ গুণ হল, সুষ্ঠু এন্তেজাম। তাঁর সুষ্ঠু এন্তেজামের ফলে নানুপুর মাদরাসাটি পুষ্পের ন্যায় ফুটে উঠেছিল। লালপোল মাদরাসায় কদম রাখলেও মাদরাসার সুষ্ঠু এন্তেজাম দেখে অন্তরে শীতলতা অনুভব হয়।
এ মহান মনীষীর সংক্ষিপ্ত জীবনী এতটুকু লিখে শেষ করা হল। আল্লাহ তা’আলা তাঁর ছায়া আমাদের উপর দীর্ঘ করুন। এবং তাঁর ইলম ও ফয়েয দ্বারা সমগ্র উম্মতকে উপকৃত করুন। আমীন।

আহলে হক ওয়াজ

আর্কাইভ

SunMonTueWedThuFriSat
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
1234567
15161718192021
22232425262728
2930     
       
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30      
error: দয়া করে কপি করা থেকে বিরত থাকুন, ধন্যবাদ।