খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে বিভিন্ন ধর্ম ও সেগুলোর অনুসারীগণ : এক নজরে

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী পৃথিবীর বড় বড় ধর্ম,প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ও সেসবের বিধি-বিধানসমূহ (যেগুলো ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা ও জ্ঞানের ময়দানে বিভিন্ন সময় তাদের নির্ধারিত ভূমিকা পালন করেছিল) শিশুদের ক্রীড়া-কৌতুকের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল এবং বিকৃতির পতাকাবাহী, মুনাফিক, খোদাভীতিহীন ও বিবেকহীন ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিগত স্বার্থের লক্ষ্যে ও কালের কুটিল চক্রান্ত ও বিপর্যয়ের এমন শিকারে  পরিণত হয়েছিল যে, সেসবের আসল রূপ চিনে নেয়া কষ্টকরই নয়, বরং বলা চলে, অসম্ভব ছিল। যদি ঐসব ধর্মের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠাতা, পতাকাবাহী ও সম্মানিত নবীগণ পুনরায় ফিরে এসে এই অবস্থা দেখতেন তবে তাঁরা তাঁদের রেখে যাওয়া ধর্মকে নিজেরাই চিনতে পারতেন না এবং ঐসব ধর্মের সঙ্গে নিজেদের জড়িত করার জন্য কখনো প্রস্তুত হতেন না।

ইয়াহুদী ধর্ম ছিল কতগুলো নিষ্প্রাণ রীতিনীতি ও কিংবদন্তীর সমাহার যার মধ্যে জীবনের কোন স্পন্দন মোটেই ছিল না। এ ছাড়া ইয়াহুদী ধর্ম স্বয়ং একটি বংশীয় ও সম্প্রদায়গত ধর্ম বিধায় এর নিকট বিশ্বের জন্য কোন পয়গাম, পৃথিবীর তাবৎ জাতিগোষ্ঠীর জন্য কোন আবেদন এবং মানবতার জন্য তার রোগ মুক্তির জন্য কোন প্রতিকার ও প্রতিষেধক ছিল না।

এই ধর্ম স্বয়ি তাওহিদী আকীদার ওপরও বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিচিতি ছিল যার ভেতর তার সম্মান ও মর্যাদা এবং প্রাচীনকালে বনি ইসরাঈলের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য প্রচ্ছন্ন ও লুক্কায়িত রয়েছে এবং যার ওসিয়ত করেছিলেন হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁদের পুত্রদেরকে দৃঢ়পদ থাকতে পারেনি। ইয়াহুদীরা তাদের প্রতিবেশী জাতিগোষ্ঠীর প্রবাবে অথবা বিজয়ী জাতিগোষ্ঠীগুলো চাপে তাদের বহু আকীদা তথা দর্শবিশ্বাস কবুল করে নেয় এবং তাদের বহু অভ্যাস, শির্কমূলক, পৌত্তলিক ও জাহিলী গালগল্প তথা কিংবদন্তী গ্রহণ করে, বিবেকবান কোন কোন ইয়াহুদী ঐতিহাসিক এর স্বীকারোক্তি করেছেন। Jewish Encyclopedia- এর নিবন্ধকার লিখেছেন :

মুর্তি পূজার বিরুদ্ধে নবীদের ক্রোধ ও কুপিত হওয়া তেকে একথা প্রকাশ পায়, দেবতার পূজা-অর্চনা ইসরাঈলী জনসাধারণের অন্তর-রাজ্যে আসন গেড়ে বসেছিল এবং ব্যবিলনের নির্বাসন থেকে ফেরার সময় পূর্ণরূপে এর নির্মূল হয়নি। কল্পনা পূজা ও যাদুর মাধ্যমে বহু শির্কমূলক ধ্যান-ধারণা ও রসম-রেওয়াজ আবারও জনগণ গ্রহণ করেছিল। তালূদ থেকেও এর সাক্ষ্য মেলে, মুর্তি পূজার মধ্যে ইয়াহুদীরা বিরাট আকর্ষণ খুঁজে পেত।

ব্যবিলনের তালমূদ (যাকে ইয়াহুদীদের মধ্যে সীমাতিরিক্ত পবিত্র জ্ঞান করা হতো এবং কোন কোন মুহূর্তে তাওরাতের ওরও একে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে যা খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে ইয়াহুদীদের মধ্যে জনপ্রিয় ও প্রচলিত ছিল) স্বল্প বুদ্ধি, কটুকাটব্য, খোদার নিকটে ধৃষ্টতা প্রদর্শন, মূলতত্ত্ব ও স্বীকৃত সত্যের সঙ্গে এবং দীন ও বৃদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরার এমন সব অদ্ভুত ও বিস্ময়কর নমুনা দ্বারা পূর্ণ যা দেখে ঐ শতাব্দীতে ইয়াহুদী সমাজের চেতনা ও ভাবনার অধঃপতন এবং ধর্মীয় রুচি বিকৃতির পূর্ণ পরিমাপ করা যায়।

খ্রিস্টবাদ তার জন্ম ও বিকাশের প্রথম প্রভাতেই চরমপন্থীদের সৃষ্ট বিকৃতি, মূর্খ জাহিলদের মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও রোমক খ্রিস্টানদের পৌত্তলিকতার শিকার হয়ে গিয়েছি। হযরত ঈসা মসিহ আ. এর সহজ-সরল তথা অনাড়ম্বর ও পবিত্র শিক্ষামাল ঐ সমস্ত ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। তাওহিদ ও ইখলাসের সাথে আল্লাহর ইবাদতের নূর গভীর মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।চতুর্থ শতাব্দীর শেষে খ্রিস্টান সমাজে ত্রিত্ববাদের আকীদা-বিশ্বাস কিভাবে ঢুকে পড়েছিল এবং কিভাবে তা সংক্রমিত হয়েছিল সে সম্পর্কে একজন খ্রিস্টান মনীষী লিখেছেন:

“এই আকীদা বা ধর্ম বিশ্বাস, ‘এক আল্লাহ তিনটি মৌলিক বস্তুর সংমিশ্রণ’ চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকেই খ্রিস্টান বিশ্বের গোটা জিন্দেগী ও চিন্তাধারায় ঢুকেছিল এবং দীর্ঘকাল যাবত সরকারি ও স্বীকৃত আকীদা-বিশ্বাস হিসাবে, যা গোটা খ্রিস্টান বিশ্ব মান্য করত, অবশিষ্ট থাকে, এমন কি খ্রিস্টায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই আকীদা-বিশ্বাসের পরিবর্তন ও এই আকৃতি ধারণ পর্যন্ত পৌঁছুবার গোপন রহস্যভেদ হয়।”

একজন সমসাময়িক খ্রিস্টান ঐতিহাসিক খ্রিস্টান সমাজে পৌত্তলিকতার সূচনা, এর নিত্য নতুন রূপ এবং অপরাপর মুশরিক ও পৌত্তলিক জাতিগোষ্ঠীর (তাদের ধর্মীয় ও জাতীয় প্রথা-পদ্ধতি ও নিদর্শনসমূহ, আচার অভ্যাস, পালা-পার্বণ ও অনুষ্ঠানগুলোতে) অন্ধ আনুগত্য, ভয়-ভীতি কিংবা মূর্খতার ভিত্তিতে তাদের হুবহু নকল করবার প্রবণতা এবং ব্যাপারে খ্রিস্টানদের নিত্য নতুন কলা-কৌশল আলোচনা করেছেন। তিনি তাঁর The History of Christianity in the light of Modern Knowledge নামক গ্রন্থে বলেন:

“পৌত্তলিকতা শেষ হলো বটে কিন্তু একেবারে ধ্বংস হলো না, বরং তা আত্মস্থ করে নেয়া হলো। প্রায় সবকিছুই, যা পৌত্তলিকতার মধ্যে ছিল, তা খ্রিস্ট ধর্মের নামে চলতে লাগল। যে সমস্ত লোকের তাদের দেবদেবী ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের থেকে হাত গুটাতে হয়েছিল তারা অবচেতনভাবে খুব সহজেই ধর্মের জন্য জীবন দানকারী কোন শহীদকে প্রাচীন দেবতার গুণে গুণান্বিত করে কোন স্থানীয় প্রস্তর কিংবা ধাতুনির্মিত প্রতিকৃতিকে তার নামে নামকরণ করল এবং এভাবে কুফরী মতবাদ ও পৌরাণিক কাহিনী ঐ সব স্থানীয় শহীদের নামে নামাংকিত হয়ে গেল এবং আল্লাহর গুণে গুণান্বিত ওলী-আওলিয়ার আকীদার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। ঐ সব ওলি- আওলিয়া একদিকে তো আরাইউসীনদের আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ ও তার স্রষ্টার মাঝে স্বর্গীয় ঐশ্বরিক মর্যাদার অধিকারী মানুষের রূপ ধারণ করল এবং অপরদিকে এ মধ্যযুগের পবিত্রতা ও সাধুতার প্রতীকে পরিণত হলো। পৌত্তলিক হোলি ও দেয়ালি উৎসব গ্রহণ করে সে সবের নাম পাল্টে দেয়া হয়, এমনকি ৪০০ খ্রি. পর্যন্ত পৌঁছাতে সূর্য দেবতার প্রাচীন উৎসব যীশু খ্রিস্টের জন্মদিনের রূপ ধারণ করল।”

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে সিরিয়া ও ইরাকের খ্রিস্টান ও মিসরের খ্রিস্টানদের যুদ্ধ পূর্ণ শক্তিতে চলছিল। আর এই যুদ্ধ চলছিল যীশু খ্রিস্টের হাকীকত ও মাহিয়ত নিয়ে অর্থাৎ যীশুর পবিত্র সত্তা ঐশ্বরিক অথবা পার্থিব ও তাতে কোন অংশ কতটা এবং এই যুদ্ধের দরুন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, গির্জা ও বাড়িঘর সবকিছু প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল যারা একে অপরকে কাফির তথা অবিশ্বাসী ঘোষণা করত। তারা একে অপরের রক্ত পিপাসুতে পরিণত হয়েছিল। তাদের যুদ্ধরত দেখে মনে হচ্ছিল, এ বুঝি দু’টি ভিন্ন ধর্ম ও বিরোধী জাতিগোষ্ঠীর যুদ্ধ।  সেজন্য খ্রিস্টানদের এ অবকাশ ছিল না, পৃথিবী জুড়ে অরাজকতা, বিপর্যয়রোধে ও অবস্থার সংশোধনে তারা চেষ্টা চালাবে এবং মানবতাকে কল্যাণ ও মুক্তির জন্য পয়গাম দেবে।

মজূসীরা (ইরানের অগ্নিউপাসক পার্সি সম্প্রদায়) প্রাচীনকাল থেকে সৃষ্টির মৌলিক উপাদান চতুষ্টয়ের বৃহত্তম উপাদান অগ্নির পূজা করত এবং তারা এর জন্য নির্দিষ্ট অগ্নিকুণ্ডলী ও উপাসনাগৃহ তৈরি করেছিল। দেশের সর্বত্র অগ্নি পূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এজন্য সুশৃঙ্খল আইন ও সূক্ষ্ম বিধি-বিধান নির্ধারিত ছিল এবং সে অনুসারে আমল করা ছিল বাধ্যতামূলক। অগ্নি পূজা ও সূর্যকে পবিত্র জ্ঞান করা ছাড়া আর সব দর্শন ও ধর্মবিশ্বাস সেখানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। তাদের নিকট ধর্ম কয়েকটি প্রথা-পদ্ধতি কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের বেশি আর কোন মূল্য বহন করত না যেগুলো তারা নির্দিষ্ট জায়গায় পালন করত। উপাসনাগৃহের বাইরে তারা ছিল একেবারে মুক্ত ও স্বাধীন যেখানে তারা নিজেদের খেয়াল-খুশি ও মর্জি মোতাবিক জীবন যাপন করত। একজন অগ্নিউপাসক ও একজন বেদীন, বিবেকহীন ও অপদার্থের মধ্যে বিশেষ কোন ব্যবধান ছিল না।১০

“সাসানী আমলে ইরান” গ্রন্থের লেখক আর্থার ক্রিস্টিনসেন সে যুগের ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন, “সরকারি কর্মচারীদের জন্য দিনে চারবার সূর্য পূজা করা আবশ্যিক কর্তব্য ছিল। চন্দ্র পূজা, অগ্নি পূজা ও পানি পূজা ছিল এর অতিরিক্ত। শয়ন, জাগরণ, গোসল পৈতা পরিধান, খানাপিনা, হাঁচি দেয়া, চুল ছাঁটা, নখ কাটা, পেশাব-পায়খানা, প্রদীপ জ্বালানো, মোটকথা সকল কাজের জন্যই মন্ত্র ছিল এবং এগুলো করা তাদের জন্য ছিল জরুরি। তাদের ওপর এও নির্দেশ ছিল, অগ্নিশিখা সদা প্রজ্বলিত ও অনির্বাণ থাকবে, কোন অবস্থাতেই তা নেভানো যাবে না বেং আগুন ও পানি একে অপরের সঙ্গে যেন না মেশে আর ধাতব পদার্থে যেন মরিচ না পড়ে! কেননা ধাতব পদার্থ তাদের দৃষ্টিতে পবিত্র ছিল।”১১

ইরানের লোকেরা আগুনের দিকে মুখ করে পূজা করত। ইরানের শেষ সম্রাট ইয়াযদগির্দ একবার সূর্যের কসম খেয়ে একথা বলেছিল:

“আমি সূর্যের কসম খাচ্ছি, যিনি সবচেয়ে বড় উপাস্য।” তিনি সেসব খ্রিস্টানকে, যারা খ্রিস্ট ধর্ম থেকে তওবা করেছিল, বাধ্য করেছিলেন তাদের ধর্মনিষ্ঠা প্রমাণের জন্য সূর্যের পূজা করতে।১২ ইরানের লোকেরা সর্বকালে ও সর্বযুগেই দ্বিত্ববাদের শিকার ছিল অর্থাৎ তারা দুই খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল, এমনকি এটাই তাদের আলামত ও পরিচয় দানকারী চিহ্নে পরিণত হয়। তারা দুই খোদার সমর্থক ছিল। এক খোদা আলোর বা কল্যানের যাকে তারা আহুর মর্যাদা বা ইয়াযদান বলত। দ্বিতীয় খোদা অন্ধকার বা মন্দের যার নাম রেখেছিল তারা আহরিমান। তাদের বিশ্বাস ছিল, এই দুই খোদার মধ্যে নিজেদের দ্বন্দ্ব ও শক্তি পরীক্ষা আগাগোড়া চলে আসছে।১৩

“ইরানী ধর্মের এসব ঐতিহাসিক তাদের উপাস্যদের সম্পর্কে যেসব কাহিনী লিখেছেন এবং গোটা পৌরাণিক উপাখ্যান তৈরি করেছেন, তা তাদের অত্যুদ্ভূত বিস্ময়প্রিয়তা এবং বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয়ে গ্রিক কিংবা ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনী থেকে কোনভাবেই কম নয়।”১৪

বৌদ্ধ ধর্ম, যা ভারতবর্ষ ও মধ্যএশিয়াতে বিস্তার লাভ করেছিল, তাও একটি পৌত্তলিক ধর্ম হয়ে গিয়েছিল। মূর্তি বৌদ্ধ ধর্মের লাগাম ধরে পথ চলছিল।যেখানেই তাদের কাফেলা বিশ্রাম মানসে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ছাউনি ফেলত সেখানেই গৌতম বুদ্ধের মূর্তি স্থাপন করা হতো এবং দেখতে না দেখতেই একটি উপাসনাঘর তৈরি হয়ে যেত।১৫

জ্ঞানী পণ্ডিতমহল এখন পর্যন্ত এই ধর্ম ও এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে সন্দিহান, আসমান-জমিন, এমনকি স্বয়ং মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর অস্তিত্বে তার বিশ্বাস ছিল কি না অর্থাৎ তিনি স্বয়ং স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন কি না। তারা তো বিস্মিত, স্রষ্টার প্রতি ঈমান ও গভীর বিশ্বাস ছাড়া এই বিরাট ধর্ম কিভাবে টিকে রইল!১৬

থাকল হিন্দু ধর্ম! এ হিন্দু ধর্ম তো দেবদেবীর সংখ্যার দিক দিয়ে অপরাপর ধর্মের তুলনায় অনেক অগ্রসর। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মূর্তিপূজার ছিল রমরমা রাজত্ব। এই শতকে তাদের উপাস্য দেবতার সংখ্যা তেত্রিশ কোটিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। মোটের ওপর প্রতিটি বৃহৎ কিংবা ভয়াবহ অথবা উপকারী বস্তুই ছিল তাদের উপাস্য দেবতা। মূর্তি নির্মাণ ও ভাস্কর্য তৈরি বিদ্যা চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল এবং এ ক্ষেত্রে নিত্য নতুন কলাকৌশল বের হচ্ছিল।১৭

একজন হিন্দু মনীষী (সি.ভি. বৈদ্য) তার History of Medieval Hindu India নামক গ্রন্থে রাজা হরিশ (৬০৬-৬৪৮খ্রি.) সম্পর্কে লিখেছেন- মনে রাখতে হবে, এ সেই যুদ যার পরেই আরব উপদ্বীপে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে।

“এ যুগে হিন্দু ধর্ম ও বৌদ্ধমত উভয়ই সমভাবে পৌত্তলিক ছিল, বরং খুব সম্ভব পৌত্তলিকতার দিক দিয়ে বৌদ্ধমত হিন্দু ধর্মের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গিযেছিল। প্রকৃতপক্ষে এ ধর্মের যাত্রাই শুরু হয়েছিল আল্লাহর অস্তিত্বের অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুদ্ধকেই সবচেয়ে বড় খোদার আসনে বসিয়ে দিল।পরে আরও অন্যান্য খোদা, যেমন Bodhisatvas -এর বৃদ্ধি ঘটতে থাকে, বিশেষত বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান শাখায় পৌত্তলিকতা চূড়ান্তভাবে আসন গেড়ে বসে। ভারতবর্ষে তা এতটা উন্নতি করতে সক্ষম হয় যে, প্রাচ্য ভাষাগুলোতে বুদ্ধের নাম পৌত্তলিকতার এক অর্থেই পরিণত হয়।১৮

এতে কোনই সন্দেহ নেই, সে যুগে মূর্তি পূজা গোটা পৃথিবী জুড়েই বিস্তৃত ছিল। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবী পৌত্তলিকতার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। খ্রিস্ট ধর্ম, সেমিটিক ধর্মসমূহ, বৌদ্ধ ধর্ম মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপনের একে অপরকে অতিক্রম করবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল।১৯

আরো একজন হিন্দু মনীষী তার Popular Hinduism : The Religion of the Masses নামক গ্রন্থে বলেন :

খোদা তৈরির কর্ম-কৌশল এখানেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং বিভিন্ন যুগে এই খোদায়ী একাডেমি বা কাউন্সিল এত বিরাট পরিশানে বৃদ্ধি পায় যে, তার পরিমাপ করাই কঠিন। এগুলোর মধ্যে ভারতবর্ষের প্রাচীন বাসিন্দাদের বহু উপাস্য দেবতাও ছিল যেগুলোকে হিন্দু ধর্মের দেবতা ও ভগবানগুলো সাথে একীভূত করে নেয়া হয়েছিল। কালক্রমে এসব দেবতার সংখ্যা তেত্রিশ কোটিতে গিয়ে পৌঁছে।২০

আরবদের সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তাতে দেখা যায়, প্রাচীনকালে তারা দীনে ইবরাহীম আ.-এর ধারক-বাহক ছিল এবং তাদের ভূখণ্ডেই আল্লাহর ্প্রথম ঘর নির্মিত হয়। কিন্তু নবুোয়াত ও আম্বিয়ায়ে কেরামের সঙ্গে কালের দূরত্ব ও আরব উপদ্বীপে কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে তারা খুবই নিম্নস্তরের পৌত্তলিকতার মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যাদের দৃষ্টান্ত ভারতবর্ষের মূর্তি পূজক ও মুশরিক ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যেত না। তারা শিরক ও মূর্তি পূজার ক্ষেত্রে বহু দূর এগিয়ে গিয়েছিল এবং এক আল্লাহর পরিবর্তে বহু উপাস্য দেবতায় তারা বিশ্বাস করত। এসব নিজেদের তৈরি উপাস্য দেবতা গোটা সৃষ্টিজগতের ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বিধানে আল্লাহর সঙ্গে শরীক, কল্যাণ-অকল্যাণ ও লাভ-ক্ষতির মালিক এবং কাউকে জীবিত রাখার বা মারার ব্যক্তিগত ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করত। গোটা আরব জাতিগোষ্ঠী পৌত্তলিকতার মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিল। প্রতিটি গোত্র ও এলাকার পৃথক উপাস্য দেবতা ছিল। যদি বলা হয়, আরবের প্রতিট ঘরই একেটি পুতুল ঘরে পরিণত হয়েছিল, তা অত্যুক্তি হবে না।২১

কাবা শরীফের ভেতরে ও এর প্রাঙ্গণে, যে ঘর হযরত ইব্রাহীম আ. কেবল আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর জন্যই নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে তিন শত ষাটটি মূর্তি স্থান পেয়েছিল।২২

তারা মূর্তি পূজা ও দেবদেবীর পূজা-অর্চনা থেকে অগ্রসর হয়ে শেষকালে সব ধরনের পাথরকেই পূজা করতে শুরু করেছিল। তারা ফেরেশতা, জিন ও তারকারাজিকেও তাদের উপাস্য মনে করত। তারা বিশ্বাস করত, ফেরেশতারা আল্লাহ কন্যা সন্তান এবং জিনেরা আল্লাহর অংশীদার। এজন্য তারা এসবের শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাসী ছিল এবং এর পূজা-অর্চনাকে কোনক্রমেই বাদ দিত না।২৩

৩. ঐসব প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর (যারা বড় বড় বিখ্যাত ধর্মের পতাকাবাহী ছিল) ধর্মগ্রন্থসমূহ যে নির্মম ও নির্দয়বাবে বিকৃতির শিকার হয়েছিল, বরং যেভাবে সেসবের রূপ ও মূল বিষয়বস্তু কদাকার করা হয়েছিল, এর বিস্তারিত বিবরণ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও দলিল-দস্তাবেজ এবং স্বয়ং তাদের জ্ঞানী-গুণী ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের স্বীকারোক্তির আলোকে তাওরাত ও ইনজীল-এর যাত্রা থেকে নিয়ে ইরানের ধর্মগ্রন্থ আভেস্তা ও ভারতবর্ষের বেদ পর্যন্ত মিলবে। আমার লেখা منصب نبوت اوراسکےعالی مقام حاملین নামক গ্রন্থের ৭ম অভিভাষণ (খতমে নবুওয়াত), ২২৮-২৪২ দেখুন। (ই.ফা. থেকে এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে)।
৪.  Jewish Encyclopedia Vol. xii P. 568-69.
৫. তালমূদ অর্থ ইয়াহুদীদের ধর্ম ও আদব-কায়দা শিক্ষা গ্রন্থ। এটি প্রকৃত পক্ষে ইয়াহুদী পণ্ডিতদের শরীয়ত গ্রন্থ আল-মুশাল্লাহর টীকা-ভাষ্যের সংকলন যা বিভিন্ন যুগে প্রচলিত ছিল।
৬. বিস্তারিত জানতে চাইলে দেখুন ‘তালমূদের আলোকে ইয়াহুদী সম্প্রদায়’ ড. রোহলিঙ্গ কৃত, ড. ইউসুফ হান্নাকৃত এর আরবী তরজমা-  الکنزالمرصودفی قواعدالتلمود
৭. New Catholic Encyclopedia. Vol. 14, 1961 থেকে উদ্ধৃত, নিবন্ধ তিন পবিত্রাত্ম, ১ম খন্ড, ২৯৫ পৃ. সংক্ষেপিত।
৮. Rev. James Houston Bexter-কৃত, গ্লাসগো, ১৯২৯, পৃ. ৪০৭। 
৯. আলফ্রেড বাটলারের গ্রন্থ Arabs, Conquest of Egypt and Last Thirty years of Roman dominion, অক্সফোর্ড ১৯০২, পৃ. ৪৪-৫।
১০. সাসানী আমলে ইরান, ১৫৫ পৃ.।
১১. সাসানী আমলে ইরান, ১৫৫ পৃ.।
১২. প্রগুক্ত, ১৮৬-৮৭ পৃ.।
১৩. প্রাগুক্ত, অধ্যায়, যরদশত ধর্ম: সরকারী ধর্ম, ১৩৩ পৃ.।
১৪. প্রাগুক্ত, ২০৪+২-৯ পৃ.।
১৫. দ্র. “হিন্দুস্তানী তামাদ্দুন” উর্দু অনুবাদ, ঈশ্বরী টোপাকৃত, ২০৯ পৃ. অধ্যাপক তাহযীব হিন্দ, হায়দারাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়; তাছাড়া পণ্ডিত নেহরুর Discovery of India, ২০১-২পৃ.।
১৬. দ্র. ইনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকার বৌদ্ধ ধর্মের ওপর লিখিত নিবন্ধ।
১৭. দ্র. আর.সি. দত্তের গ্রন্থ Ancient India, ৩য় খ., ২৭৬ পৃ. ও L.S.S O Mattey; Popular Hinduism- The Religion of the Masses (Cambridge 1935) পৃ., ৬-৭।
১৮.  Vol 1, Ponna 1921 P. 101 ফারসি. ও উর্দূ সাহিত্যে মূর্তি শব্দটি যেরূপ অধিক হারে ব্যবহার করা হয়েছে তাতে করে এরসত্যতার সমর্থন মেলে। এমনিতেও বুদ্ধ ও বুত শব্দ শুনতেও কাছাকাছি মনে হয়।
১৯.  C.V. Vaidya, History of Medical Hindu India, Vol. Poona 1921, P. 101.
২০. L.S.S O. Malley C.I.F. ICS. Popular Hinduism: The Religion of the Masses (Cambridge 1935), পৃ. ৬, ৭।
২১. দ্র. ইবনুল-কলবীর কিতাবুল-আসনাম।
২২. সহীহ বুখারীর কিতাবুল-মাগাযী মক্কা বিজয় শীর্ষক অধ্যায়।
২৩. কিতাবুল-আনাম, পৃ.৪৪।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: দয়া করে কপি করা থেকে বিরত থাকুন, ধন্যবাদ।